বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছেন তিনি।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে গণসংবর্ধনায় যোগ দেন। বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থল- পুরো পথে ছিলো লাখো নেতা-কর্মীর স্রোত। তারেক রহমানও পুরো পথে সবাইকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।
সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছে তারেক রহমান উপস্থিত লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সারা দেশের মানুষের উদ্দেশে এক ঔতিহাসিক ভাষণ দেন।
পাঠকদের জন্য তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ হুবহু তুলে ধরা হলো—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় বাংলাদেশ,
উপস্থিত প্রিয় মুরুব্বিবর্গ, মঞ্চে উপস্থিত জাতীয় নেতৃবৃন্দ, আমার সামনে উপস্থিত প্রিয় ভাই ও বোনেরা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে যারা দেখছেন এই অনুষ্ঠান, প্রিয় ভাই-বোনেরা, প্রিয় মা-বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ প্রথমেই আমি রাব্বুল আলামীনের দরবারে হাজারো লক্ষ কোটি শুকরিয়া জানাতে চাই- রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতে আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি, আপনাদের দোয়ায়, আপনাদের মাঝে।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ৭৫ এ আবার ৭ই নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তীতে ৯০ এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ, এদেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু, তারপরেও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ২০২৪ সালে ৭১ সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ২০২৪ সালে এদেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ- কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারীপুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত নির্বিশেষে শ্রেণী পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষ সেদিন ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায়, তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার পাবে।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ আমাদের সময় এসেছে সকলে মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই, সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো আমরা- যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু যে-ই হোক না কেন- নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী ৪ কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য পাঁচ কোটির মতন শিশু, ৪০ লক্ষের মতন প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন, কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। এই মানুষগুলোর একটি প্রত্যাশা আছে এই রাষ্ট্রের কাছে। এই মানুষগুলোর একটি আকাঙ্ক্ষা আছে এই দেশের কাছে। আজ আমরা সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ হই। আজ আমরা যদি সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই- তাহলে আমরা এই লক্ষ কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি ইনশাআল্লাহ।আমাদের পাশে থাকেন, আপনারা যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ, আমরা ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আসুন আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করি, আমরা যেন হে রাব্বুল আলামীন, হে একমাত্র মালিক, হে একমাত্র পরবারদিগার, হে একমাত্র রহমত দানকারী, হে একমাত্র সাহায্যকারী, আজ আপনি যদি আমাদেরকে রহমত দেন তাহলে আমরা এই দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব।
আজ যদি আল্লাহর রহমত এই দেশ এবং এই দেশের মানুষের পক্ষে থাকে আল্লাহর সাহায্য, আল্লাহর দয়া এই দেশের মানুষের উপরে এই দেশের উপরে থাক্ ইনশাআল্লাহ আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ আসুন আমরা সকলে মিলে প্রতিজ্ঞা করি যে, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সকলে নবী করীম (সা) ন্যায়পরণয়তা, সেই ন্যায়পরাণয়তার আলোকে আমরা দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ আপনারা জানেন এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। একটি মানুষ যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসেছেন, তার সাথে কি হয়েছে আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসাবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আজ আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যাতে সুস্থ হতে পারেন।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছে, অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে যাদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে আমি কোনভাবেই ফেলে যেতে পারি না। এবং সেজন্যই আজ হাসপাতালে যাবার আগে আপনাদের প্রতি সহ টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে যারা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আসুন আমাদেরকে আজকে নিশ্চিত করতে হবে, আমরা যে ধর্মের মানুষ হই, আমরা যে শ্রেণীর মানুষ হই, আমরা যে দলেরই রাজনৈতিক দলের সদস্য হই, অথবা একজন নির্দলীয় ব্যক্তি হই, আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে, যেকোন মূল্যে আমরা আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলাকে ধরে রাখতে হবে। যেকোন মূল্যে যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিত্যাগ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। শিশু হোক, নারী হোক, পুরুষ হোক, যেকোনো বয়স, যেকোনো শ্রেণী, যেকোনো পেশা যেকোনো ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদ থাকে- এই হোক আমাদের চাওয়া আজকে।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, আসুন সবাই মিলে আজ আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, সবাই মিলে করবো কাজ, গড়বো মোদের বাংলাদেশ, ইনশাআল্লাহ।
আপনাদের সকলের কাছে দোয়া চেয়ে, আবারো সকলকে যেকোনো মূল্যে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে, যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিহার করে, ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। আবারো আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আজকে আমাকে এভাবে বরণ করে নেওয়ার জন্য। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ। আসসালামু আলাইকুম।












