বুধবার, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৩৩০ দুষ্কৃতিকারী চট্টগ্রামে প্রবেশ-অবস্থান নিষিদ্ধ করলেন সিএমপি কমিশনার

নিজস্ব প্রতিবেদক;

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) শহরজুড়ে অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে ৩৩০ জনের একটি নতুন ‘ওয়ান্টেড তালিকা’ প্রকাশ করেছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-বিশেষ করে হত্যা মামলা, দস্যুতা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি ও হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা একাধিক পিসিআর (পুলিশ কেস রেকর্ড) রয়েছে। পুলিশ বলছে, এই ব্যক্তিরা চট্টগ্রাম শহরের নিরাপত্তার জন্য ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরির কারণ হয়ে উঠেছে।শনিবার দুপুরে এই গণবিজ্ঞপ্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়।

গণবিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮–এর ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তা এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য … সংযুক্ত তালিকায় বর্ণিত দুষ্কৃতিকারীদের মহানগর এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হলো।

এতে আরো বলা হয়, এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গণবিজ্ঞপ্তির শেষে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষর করেন। বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে ১২ পৃষ্ঠার তালিকা সংযুক্ত রয়েছে।

সিএমপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কেউই এখন থেকে চট্টগ্রাম শহরের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবেন না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হবে এবং শহরে ঢোকার চেষ্টা করলেই গ্রেপ্তার করা হবে।

চট্টগ্রাম পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ বলেন, ৩৩০ জনের তালিকা শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। এদের বড় অংশই পলাতক, এবং তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক পিসিআর। আমরা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি এই তালিকাভুক্ত কেউই চট্টগ্রাম শহরের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে না।

তিনি আরো বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা তালিকাভুক্তদের চলাচল নজরদারিতে রেখেছি। শহরে প্রবেশের সম্ভাব্য সব পথেই অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। কেউ যদি ছদ্মবেশে বা ভিন্ন রুটে ঢুকতে চেষ্টা করে, তবুও শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি।

আমিনুর রশিদের ভাষায়, চট্টগ্রাম বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক জীবনরেখা। বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, টানেল—এসবের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে আমরা পারি না। অপরাধীরা শহরে ঢুকতেই না পারলে বড় ধরনের নাশকতার সুযোগও কমে যাবে।

মানবাধিকার প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি কোনো ‘স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা’ নয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনী প্রক্রিয়ায় নেওয়াই লক্ষ্য। শহরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ মূলত একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।

তালিকায় কারা আছেন

সিএমপি জানিয়েছে, ৩৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৩ থেকে ২৫টির মধ্যে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, জুলাই অভুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামী সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, সাইফুল আলম লিমন, সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে গাজী শফিউল আজিম, শৈবাল দাশ, সাহেদ ইকবাল, জহরুল আলম জসিম, মোহাম্মদ হোসেন হিরণ, নাজমুল হক, হাসান মুরাদ, গিয়াস উদ্দিন, নূর মুস্তাফা, আবুল হাসনাত বেলাল, জিয়াউল হক সুমন, মোবারক হোসেনসহ নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাবেক কাউন্সিলর যুবলীগের দেবাসিষ পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সা.সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর, সাবেক সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমুসহ ৩৩০ জন।তালিকায় সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছেন বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী, তাঁর সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন (ছোট সাজ্জাদ), মোবারক হোসেন, মোহাম্মদ রায়হান, খোরশেদ, ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না শারমিন, ইসমাইল হোসেন, শহিদুল ইসলাম বুইস্যা, নুরুল আলম উরফে হামকা আলম।

তারা সবাই কেউ হত্যা কেউ অস্ত্র মামলার আসামি। কেউ কেউ মাদক সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীর নেতা, রাজনৈতিক হামলা ও নাশকতা মামলার আসামি এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চক্রের পরিচিত সদস্য

তালিকায় বেশ কয়েকজন পুরোনো সন্ত্রাসীও আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক।

চট্টগ্রাম নগরীর ১৭টি প্রবেশপথে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মোবাইল ট্র্যাকিং, মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা (ফেসিয়াল রিকগনিশন) ও বাস/লঞ্চ টার্মিনালে বিশেষ নজরদারি চলছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শহরমুখী আন্তজেলা বাসগুলোতে হঠাৎ তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোনোভাবে তাঁরা চট্টগ্রামে ঢুকতে পারবে না।

এর আগে, গত বছরের ১৩ আগস্ট সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ অস্ত্রধারীদের দেখামাত্র গুলি করার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় বন্দর থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি ওয়্যারলেসে এই নির্দেশ দেন। পরে এই বার্তার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে কমিশনার বলতে শোনা যায়, শুধু রাবার বুলেট দিয়ে কাজ হচ্ছে না, অস্ত্র বের করা মাত্র গুলি করতে হবে। পুলিশের কোনো টহল দলের সামনে কেউ ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র বের করলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাতে হবে। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

এরপর গত ১১ নভেম্বর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ব্রার্স্টফায়ারের নির্দেশ দিয়েছিলেন কমিশনার হাসিব আজিজ। ওইদিন নিজস্ব বেতার বার্তায় তিনি থানা ও টহল পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে পুলিশ কমিশনার বলেন, শটগান হবে না, চায়না রাইফেলও বাদ, এখন এসএমজি ব্রার্স্টফায়ার মুডে থাকবে। এজন্য সব দায় নিজে বহন করবেন বলে সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন তিনি।

শেয়ার করুন